WELCOME TO NANDAIL NEWS - REFLECTION OF TIME - স্বাগতম- নান্দাইল নিউজ - সময়ের প্রতিচ্ছবি - স্বাগতম- নান্দাইল নিউজ -সময়ের প্রতিচ্ছবি - স্বাগতম- নান্দাইল নিউজ - সময়ের প্রতিচ্ছবি - স্বাগতম- নান্দাইল নিউজ -সময়ের প্রতিচ্ছবি - স্বাগতম- নান্দাইল নিউজ - সময়ের প্রতিচ্ছবি - স্বাগতম- নান্দাইল নিউজ - সময়ের প্রতিচ্ছবি

সোমবার, ৩ জুন, ২০১৩


সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ-

সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ-
মাত্র দিন চারেকের জন্য শিলং এবং আসাম গিয়েছিলাম। ফিরে এসে শুনি দেশের ১৫ জন পত্রিকা সম্পাদক এক যুক্তবিবৃতিতে জনাব মাহমুদুর রহমানের মুক্তি চেয়েছেন। তাঁরা দাবী করেছেন, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা এবং দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি নামের দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রকাশনা এবং সম্প্রচার আবার শুরু করতে দেওয়া হোক। এই যুক্তবিবৃতির পক্ষে যুক্তি হচ্ছে মাহমুদুর রহমান একটি পত্রিকার সম্পাদক, কাজেই তাকে গ্রেফতার করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী। আর কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ওই দুই টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে।
সম্পাদকদের এই যুক্তবিবৃতির বিরুদ্ধে দেশের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী পাল্টা বিবৃতি দিয়ে সম্পাদকদের এই ভূমিকার নিন্দা এবং সমালোচনা করেছেন। এর পরপরই বিবৃতিতে স্বাক্ষর দানকারী সম্পাদকদের একজন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় কেন তিনি এই যুক্ত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সেটা ব্যাখ্যা করলেন।
এই চার দিনের মধ্যে এতসব কাণ্ড ঘটে যাবে, বুঝিনি। ইতোমধ্যে সম্পাদকদের একটি কাউন্সিলও গঠিত হলো। তাতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ সবই নির্ধারিত হয়ে গেল। যাঁরা এই কাউন্সিলে আছেন, তাঁরা অনেকে অবশ্যই সাংবাদিকতার জগতে বেশ প্রভাবশালী এবং এই প্রভাবের পেছনে বহুবিধ কারণও আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সম্পাদকদের একটি সংগঠন থাকা উচিত। এই সংগঠনটির দায়িত্ব হওয়া উচিত সাংবাদিকতার ভেতরে জমে ওঠা আবর্জনা পরিষ্কারের ক্ষেত্রে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করা। এমন একটি গাইডলাইন নির্ধারণ করে দেওয়া, যেখানে নৈতিকতা সততা মানবিক মূল্যবোধ থাকবে, হিংসা-দ্বেষ অসূয়ামুক্ত জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমিকা থাকবে। যেখানে সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকতার সঙ্গে অসাংবাদিকতা, অপসাংবাদিকতা, কুসাংবাদিকতা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাংবাদিকতা এবং এজেন্ডা  সাংবাদিকতার ব্যবধান সুস্পষ্টভাবে নির্ণিত থাকবে। সম্পাদক থেকে শুরু করে প্রতিটি স্তরের সংবাদকর্মীর আচরণ এবং মান, যোগ্যতা এবং যথার্থতা এর আওতাভুক্ত থাকবে। এই সংগঠনটির দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা জাতির কাছে প্রতিভাত হবে ঘনঅন্ধকারময় পরিস্থিতিতে আলোকবর্তিকার মতো।  কিন্তু অতিশয় অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, এই সংগঠনের যাত্রার সূচনা ঘটল কর্দমাক্ত পথে পা রাখার ভেতর দিয়ে।
এতখানি রূঢ়ভাবে বলার জন্য আমার অগ্রজ কিংবা অনুজপ্রতীম সম্পাদক সহযাত্রীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছি, মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবি কিংবা দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি এবং আমার দেশ সংক্রান্ত বিষয়ই যদি এই এডিটর’স কাউন্সিল গঠনের ভিত্তিভূমি হয়, তা হলে এর প্রতি সাংবাদিক সমাজের কতখানি আস্থা এবং বিশ্বাস থাকবে সেটা অবশ্যই প্রশ্ন করা যেতে পারে। আর সম্পাদকদের যুক্তবিবৃতি? এ প্রসঙ্গে আমার একটু স্মৃতিচারণ করার প্রয়োজন হয়েই পড়েছে। আমি এখানে কারো নাম উল্লেখ করতে চাই না, শুধু কতিপয় ঘটনা তুলে ধরতে চাই-
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা। পাঠক নিশ্চয়ই জানেন কী ভয়াবহ ব্যাপারটাই না ঘটেছিল সেদিন! একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক পরিকল্পনা কার্যকর করার চেষ্টা হয়েছিল ওই ২১ আগস্টে। আমি তখন দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক। হামলার খবর পাওয়ার পর পরই চলে যাই ঘটনাস্থলে, সেখান থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে। সম্ভবত শ্যামল দত্তকে সঙ্গে নিয়ে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আবদুর রাজ্জাক, ওবায়দুল কাদের, আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতাকর্মী হাসপাতালে গুরুতর আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। শুনলাম আইভী রহমানের অবস্থা বেশ খারাপ। দেখা হলো আহত আলোকচিত্র সাংবাদিক যুগান্তরের গোর্কির সঙ্গে। গোর্কি বলছিল, মাত্র তিন চার সেকেন্ড এদিক ওদিক হলে শেখ হাসিনার দেহ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেত ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর মতো। দ্রুত চলে গেলাম ধানমন্ডির ৫ নম্বরে অবস্থিত সুধা সদনে। সেখানে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানা রয়েছেন। এ আকস্মিক ঘটনায় তাঁরা স্তম্ভিত, বিস্ময় বিমূঢ়! হাসপাতালে যে সমস্ত নেতাকর্মীর শয্যার পাশে গিয়েছি, তাঁদের মুখে একই কথা- নেত্রীর কাছে যান, তাঁকে বলুন আমরা এখনও বেঁচে আছি।
 অনেকে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের সঙ্গে ২০০৪-এর ২১ আগস্টের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করেন। দুটোই বাংলাদেশের ইতিহাসে নৃশংসতম ঘটনা। ’৭৫-এ জাতির জনককে সপরিবারে বিনাশের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ফসলকে তছনছের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর ২১ আগস্টের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগকে নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করা। এই দুইয়ের মধ্যে ধারাবাহিক যোগসূত্র আছে।
স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বহুমুখী তৎপরতা সেই ’৭১-এর বিজয় অর্জনের পর থেকেই সক্রিয় এবং ক্রম সম্প্রসারণশীল।  ’৭৫-এ ছিল সরকার উৎখাতের চক্রান্ত, কাজেই সেখানে আমলা রাজনীতিক সামরিক চক্র এবং আন্তর্জাতিক অপশক্তির সম্মিলিত প্রয়াস ছিল। আর ২০০৪-এর ২১ আগস্টের ঘটনাটি ঘটিয়েছিল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি। তাদের মুঠোয় তখন আমলা পুলিশ আদালত সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন অর্থাৎ সব কিছু। এবং তাদের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা।
যাই হোক, ওই সময় আমার মনে হয়েছিল এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সম্পাদকদের একটি পরিষ্কার ভূমিকা থাকা দরকার। আমি একজন প্রভাবশালী সম্পাদককে অনুরোধ করেছিলাম যুক্তবিবৃতি দেওয়ার এবং একটি অভিন্ন সম্পাদকীয় প্রকাশের জন্য। প্রখর যুক্তিবাদী আমার সেই বন্ধু সম্পাদকটি অহমিকাকে মধুর হাসির আচ্ছাদনে মুড়িয়ে বললেন, ‘দেখ বন্ধু, আমি ওইসব জয়েন্ট ভেঞ্চারে বিশ্বাসী নই। আমি আমার কাগজে আমার মতো করে বিশ্লেষণ করব, ব্যাখ্যা করব, এমন কি তোমার পত্রিকার চাইতে আরো ভালো করে পরিবেশনও করতে পারব।  কিন্তু এভাবে যুক্তবিবৃতির নামে নিজের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করার আমি ঘোর বিরোধী।’ সম্পাদকদের যুক্তবিবৃতি এরপর আর হতে পারেনি। শুধু একুশে আগস্টই নয়, হত্যা করা হয়েছে আওয়ামী আমলের সফল অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেবসহ আহসানউল্লাহ মাস্টার, মনজুরুল ইমাম, হুমায়ুন কবির বালু, মানিক সাহা প্রমুখদের। হত্যা করা হয়েছে বিচারকদের। দেশে একসঙ্গে ৬৩টি জেলায় বোমা হামলা করা হয়েছে; যশোর, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরায় বোমা হামলা হয়েছে, ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে হত্যার জন্য বোমা হামলা হয়েছে; বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমানের উত্থান ঘটেছে, সরকারি প্রশাসনযন্ত্র তাদের নগ্নভাবে সহযোগিতা করেছে।
২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর যে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক হামলায় দলে দলে সংখ্যালঘু  নারী-পুরুষ দেশত্যাগ করেছে সেটাও তো ঘটেছে সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায়। সাংবাদিক-লেখকদের ধরে ধরে নির্যাতন করা হয়েছে রিমান্ডে নিয়ে গিয়ে, বিদেশি সাংবাদিকরাও কারানির্যাতন কিংবা রিমান্ডের হাত থেকে রেহাই পায়নি। এমন কি সম্পাদক কিংবা প্রকাশককেও জড়ানো হয়েছে সিনেমা হলের বোমা হামলার মামলায়। সেদিনও কিন্তু আমরা সম্পাদকদের কোথাও যুক্তবিবৃতি দেখতে পাইনি। সম্পাদকের মতপ্রকাশের ‘স্বাধীনতা’ খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় কী ? হতে পারে।
যখন ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি, তখনও উদ্যোগ নিয়েছিলাম সাংবাদিক হত্যার এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রশ্নে সম্পাদকদের যৌথ উদ্যোগের। না, সফল হতে পারিনি। কারণ, কোথাও কোথাও সম্পাদক যুক্তিতে, প্রভাবে, প্রচারে এবং সংযোগে আমার মতো অধমের চাইতে অনেক বেশি পারঙ্গম। অনেক প্রবীণ সাংবাদিক এবং সম্পাদককেও দেখেছি তাঁদের কারও কারও কাছে অতিশয় বিগলিত চিত্তে মাথা নাড়তে। ‘সমকাল’ পত্রিকায়  সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের সময়টা ছিল এক-এগারো পরবর্তী সেনা সমর্থিত সরকার। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সম্পাদকদের এবং সাংবাদিকদের প্রতি অবজ্ঞাসূচক আচরণ করা হয়েছিল একাধিকবার। তখনও উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু পেরে উঠিনি। পরবর্তীতে আমি আমার ‘কালের কণ্ঠ’ কলামের নামে একটি পত্রিকার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করি এবং পত্রিকাটি প্রকাশের জন্য অনুকূল বিনিয়োগকারীর অনুসন্ধানে থাকি। ঘটনাক্রমে একটি বৃহৎ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আমার ‘কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় বিনিয়োগের ইচ্ছে প্রকাশ করে। এক পর্যায়ে আমি পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও বিনিয়োগকারীদের মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অংশীদার পরিচালক হিসেবে ‘কালের কণ্ঠ’ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি। পরবর্তী পর্যায়ে আমি পত্রিকাটির নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ক্রমাগত কোণঠাসা হতে থাকি। যে পত্রিকার আংশিক মালিকানাসূত্রেও আমি প্রতিনিধিত্ব করি, সেই পত্রিকার সাংবাদিকতার মান ক্রমাগত এতো বেশি ব্যক্তিস্বার্থ প্রণোদিত হতে থাকে যা আমার পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সে সময় কিন্তু সম্পাদক মহলের একটি অংশ থেকে আমাকে অলিখিতভাবে ব্রাত্য প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হয়েছে।
প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতার কণ্টক মুকুট’ আমার মাথায় চড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি লিখিতভাবে স্বনামে প্রকাশিত কলামে এই গঞ্জনা মেনে নিয়েছি। এক সময় বাধ্য হয়ে আমাকে নিজের শ্রম ও ভালবাসায় তৈরি আত্মজকে পরিত্যাগ করতে হয়েছে পরম যাতনা নিয়ে। তখনও কিন্তু সম্পাদকদের অবস্থান থেকে সামান্যতম ইতিবাচক শব্দ উচ্চারিত হয়নি। যে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমি আমার নিজের দিকে, বয়সের দিকে, স্বাস্থ্যের দিকে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে, পারিবারিক নিরাপত্তার দিকে একবারও ফিরে তাকাইনি, সেই সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার কথা বলে আজ যুক্তবিবৃতি দিচ্ছেন পনের/ষোল জন সম্পাদক মাহমুদুর রহমান নামক এক ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের মুক্তি দাবী করে? বিবৃতিদাতারা কি জানেন না ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় ‘ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের’ পদবীটি আত্মস্থ করে দিনের পর দিন কী কুসাংবাদিকতার বিষ উদ্গীরণ করেছেন মাহমুদুর রহমান? কীভাবে সরাসরি সংবিধানকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন তিনি? এই মাহমুদুর রহমানকে পদবীর কারণে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটির কক্ষে আয়োজিত সম্পাদকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায়। সেখানে সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু সহ বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। সেখানে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেছিলেন যে, তিনি এই সংবিধানকে গ্রহণ করেন না। ক্ষিপ্ত স্বরে তিনি বলেছিলেন, এই সংবিধান বাদ দিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। সম্পাদক হিসেবে ওই সভায় উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল। শুধুমাত্র পদবীর বদৌলতে তিনি এই ধরনের উক্তি করেও কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়েননি।  ধরা যাক, জামায়াত-বিএনপি জোটের সরকারের আমলে এ ধরনের কোনো মতবিনিময় সভায় ভিন্ন চিন্তার কোনো সম্পাদক এই আচরণের এক-চতুর্থাংশ দেখালেন, সেক্ষেত্রে তার কী পরিণাম হতো! সংসদ ভবনের সীমানার ভেতরেও কি তিনি নিরাপদ বোধ করতেন? কুসাংবাদিকতার এই মূর্তিমান ব্যক্তিটিকে ‘সাহসী সম্পাদক’-এর তকমা দেওয়ার জন্য কী
কারণে এই পনের সম্পাদক এত অধীর হয়ে পড়লেন?
সম্পাদকদের যুক্তবিৃবতি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি যখন সৃষ্টি হয়েছিল তখন সবাই আত্মরক্ষায় কিংবা স্বার্থরক্ষায় নিমগ্ন হলেন, আর অপপ্রচার ও মিথ্যার বিষকুম্ভ উপুড় করে সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করলো যে ব্যক্তিটি- তার পক্ষে মুক্তকচ্ছ হয়ে সবাই নেমে পড়লেন! আমি আমার অর্ধশতাব্দীব্যাপী পেশাগত জীবনে সম্পাদকদের যুক্তবিবৃতি পড়েছি রাষ্ট্রের বিশেষ ক্রান্তিলগ্নে। কিন্তু সম্পাদকদের যুক্তবিবৃতির এহেন অপচয় কদাচ দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
শুরুতেই বলেছি, সম্পাদকদের একটি ফোরামের দরকার আছে। এই ফোরামটিকে হতে হবে সৎ সাংবাদিকতার বাতিঘর। ওই ফোরামই নির্ধারণ করে দেবে একজনের সম্পাদক হতে হলে কী ধরনের পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা থাকা আবশ্যক। ওই ফোরামের কর্তৃত্বেই নির্ধারিত হবে সাংবাদিকতার মান। অপসাংবাদিকতা, কুসাংবাদিকতা কিংবা নৈতিকতাবিবর্জিত সাংবাদিকতাকে নিষিদ্ধ এবং পরিত্যাজ্য করার কাজটি করতে হবে ওই ফোরামকেই। ওই ফোরাম কথা বলবে দেশ ও জাতির কোনো বিশেষ প্রয়োজনীয় মুহূর্তে। সরকার অপেক্ষা করবে ওই ফোরামের পরামর্শের জন্য। বিদেশী অতিথিরা অনুরোধ করবে ওই ফোরামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার। কিন্তু এখানে ব্যাপারটি কী হয়ে গেল? আমাদের দেশে ‘সম্পাদক’ পদটি এতো সুলভ? এত সহজে টাকার বিনিময়ে এটা পাওয়া যায়? ঔদ্ধত্য কি সম্পাদকের ভূষণ? ঔদ্ধত্য মানেই কি ব্যক্তিত্বের বহি:প্রকাশ?
সবশেষে একটি ঘটনার কথা বলি। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের গোড়ার দিককার কথা। জেনারেল আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ তখন দেশে পুরোপুরি জেঁকে বসেছে। তার মন্ত্রণাদাতারা তাকে পরামর্শ দিলেন- ‘হুজুর আপনার ক্ষমতা যদি পোক্ত করতে হয় তা হলে সাংবাদিকদের নিয়ে আসতে হবে আপনার হাতের মুঠোয়’। তিনি জানতে চাইলেন, কীভাবে সেটা করতে হবে? মন্ত্রণাদাতারা উত্তর দিলেন, ‘জনাব, সাংবাদিকদের কোনো বেতন কাঠামো নেই, চাকরির গ্যারান্টি নেই। এই কাজটি যদি আপনার সদাশয় সামরিক সরকার করে দেয় তা হলে আপনার শাসনকাল স্বর্ণযুগে পরিণত হবে’। এই পরামর্শ আইয়ুবের মনে ধরল। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পাদকদের সঙ্গে এবং সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক শুরু করলেন। তিনি সাংবাদিকদের জন্যে কী কী করেছিলেন, কতখানি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিধান করেছিলেন, প্রেস ট্রাস্ট গঠন করে কত কৌশলে সাংবাদিকদের ভেতরে সুবিধাভোগী স্তর সৃষ্টি করেছিলেন, কীভাবে গোয়েন্দা সাংবাদিকতা সৃষ্টি করেছিলেন সেসব প্রসঙ্গ এখানে আলোচনা করছি না। তোয়াব ভাই, গাফ্ফার ভাই, মূসা ভাই (যদি স্মৃতি তাঁকে বিভ্রান্ত না করে), লোহানী ভাই কিংবা পাকিস্তানে জীবিত আছেন নাকভী ভাইয়া- এঁরা সব জানেন। আসল কথা আইয়ুব খানই সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ বেতন কাঠামো  তৈরি করেছিলেন। তথ্য বিষয়ে তার মন্ত্রণাদাতা ছিলেন আলতাফ গহর। তুখোড় আমলা এবং সাংবাদিকদের প্রতি বিশেষভাবে দুর্বল। মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুস সালামের বেশ ঘনিষ্ঠ মানুষ।
আলতাফ গহরকে আইয়ুব খান জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আচ্ছা আলতাফ, সকলের অবস্থান তো ঠিক করলে, এবার বলো তো সরকারের সঙ্গে কোন সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ সম্পাদকদের জন্য নির্ধারণ করা যায়? পদমর্যাদায় কী প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, না মন্ত্রী- কোথায় ধরা যাবে?’ আলতাফ গহর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে বলেছিলেন, ‘ইওর এক্সেলেন্সি, ইট শুড বি নেক্সট টু ইওর পজিশন।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, একজন সম্পাদক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের প্রতিনিধি।
সমগ্র উন্নত বিশ্বে পত্রিকার সম্পাদককে এইভাবেই দেখা হয়। কোথাও কোনো পত্রিকার সম্পাদক সহজলভ্য নয়, এমনকি ভারত পাকিস্তানেও নয়। আর আমাদের দেশে একজন অপসাংবাদিকতার প্রতীক ব্যক্তির পক্ষে পনের সম্পাদকের যুক্তবিবৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ? সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশের সাংবাদিকতা!
লেখকঃ দেশ বরেণ্য সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা।

শনিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১২


সংবাদপত্রের দ্বিতীয় সংস্করণ: দ্বিতীয় চিন্তা
হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

নান্দাইল নিউজ ডেক্স:
স্থান-কাল-পাত্র ঈষৎ পরিবর্তিত, তবে ঘটনাটি সত্য। বেশ ক’বছর আগে দূরবর্তী এলাকার একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার খবর ঢাকার একটি নামি দৈনিকে বেশ ভালোই কাভারেজ দেয়া হলো। সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাগজ পৌঁছাতেও বিলম্ব হলো না। রাজধানীতে বসবাসরত সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী জেনে গেল, ‘অমুক’ কাগজে আজ তাদের এলাকার ‘তমুক’ ঘটনার খবর ছাপা হয়েছে। কৌতূহলী ‘রাজধানীপ্রবাসী’ এলাকাবাসী কাগজটি কিনতে ছুটলো। পত্রিকার স্টলে কাগজটি সহজে মিললো, কিন্তু কাগজ খুলে খবরটি আর কোথাও মেলে না।
 


প্রতি পৃষ্ঠা, প্রতি কলাম তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো। না, নেই। শেষে আবার এলাকায় টেলিফোন- কোন কাগজ, কত পৃষ্ঠায়। আবার খোঁজাখুঁজি। না, পাওয়া যাচ্ছে না। এলাকাবাসী অবশেষে পত্রিকা থেকে পুরো খবর পড়ে শোনায় ‘প্রবাসী’ স্বজনকে। প্রবাসী কি তৃপ্ত হন? না, হন না। বহুদিন নিজ এলাকা থেকে দূরে, রাজধানী ঢাকায় ‘পরবাস’ করছেন তিনি। পত্রিকার পাতায় নিজ গ্রাম বা উপজেলার খবর দেখতে ফেলে আসা মাটির গন্ধ পান। কিন্তু আজ কী হলো, মোবাইল ফোনের অপর প্রান্তে সবাই দেখতে ও পড়তে পাচ্ছে, ইনি বা এরা ঢাকায় খবরটি কাগজের পাতায় খুঁজে পাচ্ছেন না কেন?



পাচ্ছেন না কারণ, পত্রিকাটির ‘সংস্করণ’ হয়েছে। সেই সংস্করণের ধাক্কায় সংশ্লিষ্ট খবরটি একই রকম আরো অনেক খবরের সঙ্গে কাগজের বাইরে ছিটকে পড়েছে। গীতিকার লিখেছেন ও গায়ক গেয়েছেন, জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে। এ খবরটি অগোচরে ছিল না, গোচরেই আনা হয়েছিল। কিন্তু সবার নয়, কারো কারো। খবরটি মূলত তারা সবাই পড়তে পেরেছে, যারা ঘটনাটি জানে অথবা ঘটনার সঙ্গে কোনো-না-কোনোভাবে জড়িত ছিল, অর্থাৎ এককথায় সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী।



আর যাদের প্রয়োজন ছিল জানার, যারা বিশেষ করে ওই খবরটি পড়ার জন্য সেদিনের কাগজটি কিনেছিল, তারা অর্থাৎ এলাকা থেকে দূরে অবস্থানকারী এলাকাবাসী, তারা বঞ্চিত হয়েছে। এছাড়া দূরের-কাছের সব পাঠক, তথ্য জানা যাদের অধিকার, তারাও বঞ্চিত বা প্রতারিত হয়েছে। ভুললে চলবে না, একজন পাঠক একটি দৈনিক পত্রিকার দামে সেদিন ওই পত্রিকায় প্রকাশিত সব খবর পড়ার ও ছবি দেখার অধিকারটি কিনে নেন। প্রকাশিত কোনো খবর বা ছবিই তার কাছ থেকে সরিয়ে রাখা অনৈতিক ও অন্যায়।



তবুও এই কাজ বা অকাজটি হচ্ছে। নিয়ম করে এ কাজটি করে চলেছে ঢাকার দৈনিকগুলো। কেন করছে এ বিষয়ে তাদের একটি অভিন্ন ব্যাখ্যা এরকম: ‘অমুক’ কাগজ করছে, আমরা না করলে তো ‘মার’ খেয়ে যাব। ব্যাখ্যাটিকে একেবারে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। বাজার অর্থনীতির যুগ, লাগামহীন নীতিনৈতিকতাহীন হৃদয়হীন ইঁদুর দৌড়ের যুগ এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী এগিয়ে চলেছে। সুতরাং আমাকে যে-কোনোভাবেই হোক তার সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে- এটাই যুগধর্ম।



সংবাদপত্র এই যুগধর্মকে তো উপেক্ষা করতে পারে না। আর সংবাদপত্র এখন আর কোনো মিশন নয়, এটি এখন শিল্প। বিশাল পুঁজি বিনিয়োগ হয়েছে, অনেক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সুতরাং পুঁজি তার স্বাভাবিক পথেই চলবে, তাতে নীতি, নৈতিকতা কি হৃদয়বৃত্তি বা জনকল্যাণকামিতার বারোটা বা আরো বেশি বেজে যাক, কী যায়-আসে!



এ ‘যুক্তি’ও উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো...।



প্রশ্নের আগে একটি ছোট্ট গল্প বলে নিই: একবার ক্লাসে এক উদ্যমী শিক্ষক (হায়, এই ধরনের শিক্ষক বাংলাদেশে এখন বিপন্ন প্রজাতি) অনেকক্ষণ ধরে ছাত্রদের জ্যামিতি বোঝালেন যে, একটি সরলরেখার ওপর আরেকটি সরলরেখা দণ্ডায়মান হলে অর্থাৎ দাঁড়ালে দু’টি সমকোণ উৎপন্ন হয়। অনেকক্ষণ অনেকভাবে বুঝিয়ে ছাত্রদের কাছে শিক্ষক জানতে চাইলেন যে, তারা বিষয়টি বুঝেছে কি না।



শিক্ষার্থীরা সমস্বরে জানালো যে, বুঝতে তাদের বাকি নেই। শিক্ষক তবু আশ্বস্ত হতে পারেন না। বলেন, “বলো তোমাদের কারো কোনো প্রশ্ন আছে? প্রশ্ন থাকলে বলো!” এক ছাত্র জানালো, একটি সরলরেখার ওপর আরেকটি সরলরেখা দণ্ডায়মান হলে দু’টি সমকোণ যে উৎপন্ন হয়, সে বিষয়ে তার আর কোনো সংশয় নেই। তবে একটা বিষয় তার বোধগম্য হচ্ছে না।



বিষয়টি হলো, একটা সরলরেখা অনর্থক আরেকটি সরলরেখার ওপর দাঁড়াতে গেল কেন?



‘গাধা’ (পড়ুন দিব্যজ্ঞানী) ছাত্রটি ঠিকই ধরেছিল যে, শায়িত সরলরেখার ওপর দাঁড়ালে দু’টি সমকোণ উৎপন্ন হওয়ার সত্য প্রমাণ করাটা দ্বিতীয় সরলরেখার উদ্দেশ্য ছিল না, তার প্রয়োজন ছিল দু’টি সমকোণ উৎপাদন। অর্থাৎ প্রয়োজনের জন্য কাজটা করা হয়নি, কাজটা করা হবে এই জন্যই প্রয়োজনটা তৈরি করা হয়েছে। (গণিতজ্ঞ ও গণিতপ্রেমীরা অপরাধ নেবেন না, গাধাদের ভাবনাই এরকম)।



বর্তমান নিবন্ধকারও সেই গাধা ছাত্রটির মতোই ভাবে এবং ভাবনাটি মিডিয়াজ্ঞানীদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়ার দুরাশায় কলম হাতে নিয়েছে যে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সংবাদপত্রের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণ করার কোনো যুক্তি আছে কি না? নাকি সংস্করণকে যুক্তিসিদ্ধ করার জন্য এখন যুক্তি তৈরি করা হচ্ছে।



পত্রিকার একাধিকার সংস্করণ অযৌক্তিক- এ কথা প্রমাণ করা মোটেই এ লেখার উদ্দেশ্য নয়, বরং সংস্করণকে পাঠকের প্রয়োজন ও অধিকারের সঙ্গে আরো কীভাবে মিলিয়ে দেয়া যায়, সে বিষয়ক চিন্তাকে উস্কে দেয়াই এর লক্ষ্য। মিডিয়া চিন্তাবিদরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলে সংবাদপত্রের সংস্করণ প্রক্রিয়াটি আরো গ্রহণযোগ্য রূপ পাবে বলে বিশ্বাস করা যায়।



একটু পেছনে ফিরে যাই। সংস্করণের পেছনে সংবাদপত্রগুলোর প্রতিযোগিতার কথা বলেছিলাম। এ প্রতিযোগিতার মধ্যে বাণিজ্য ও প্রচারস্বার্থ যেমন রয়েছে, তেমনি পাঠককে সর্বশেষ তথ্য অবহিত করানোর ইতিবাচক চিন্তাও আছে এ কথাটি অস্বীকার করলে অবিচার করা হবে। প্রশ্ন হলো, সর্বশেষ তথ্য কোনটি এবং সেটা কখন ও কীভাবে পরিবেশন করা হবে।



‘সর্বশেষ তথ্য’ পরিবেশনের এই ধারণাটিও, অন্য অনেক কিছুর মতো, এসেছে পশ্চিমা দুনিয়া থেকে। এবং আমরাও ‘যাহা পশ্চিমা তাহাই প্রগতিশীল’ বলে উদ্বাহু নৃত্যসহযোগে ধারণাটি উদরস্থ করেছি। ভাবিনি, এই খাদ্য আমি গ্রহণ করবো কি না, করলে কতটুকু, কীভাবে এবং কোন সময়। অর্থাৎ মূল ধারণাটির সঙ্গে আমরা আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে মিলিয়ে নিইনি।



আমাদের দেশ দরিদ্র, মানুষ দরিদ্রতর। কিন্তু তবু তাদের ‘বাড়ি’ দুইটা, গ্রামের বাড়ি আর শহরের বাসা। তাদের স্বজনসংখ্যাও অনেক। নিজ গ্রাম এবং আশপাশের দশ গ্রামের সব মানুষ তাদের স্বজন। আবার শহরের মহল্লাবাসীও পর নয়। যে মানুষটি অনেক দিন ধরে শহরে থাকে, ঈদে-চাঁদে গ্রামে যায়, তারও কিন্তু নাড়িটি পোঁতা আছে গ্রামের মাটিতে।



এই নাড়ির টানে লম্বা ছুটি পেলেই যেমন শত বাধা পেরিয়ে গ্রামে ছুটে যায়, তেমনি বছরের অন্যান্য সময়ও পত্রিকার পাতায় খুঁটিয়ে খুঁটে দেখে তার ‘দ্যাশের’ কোনো খবর আছে কি না। দেখে উল্লসিত না বিমর্ষ হলো, সেকথা পরে। পাঠক হিসেবে খবরটি কিন্তু চায় সে। সংবাদপত্র শিল্পের লোকজন মানুন আর না-ই মানুন, বাংলাদেশে সংবাদপত্রসংশ্লিষ্ট একটা বড় সামাজিক বাস্তবতা এটা। পত্রিকার ‘সংস্করণ’ করার সময় এই বাস্তবতা মাথায় না রাখলে পাঠকদের বঞ্চিত বা প্রতারিত হওয়ার অভিযোগটি উঠতে থাকবে।



অবাধ তথ্যপ্রবাহের কথা বলে মানবপ্রজাতির মস্তিষ্কে প্রতি মুহূর্তে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে কোটি কোটি তথ্য। সংবাদপত্র, রেডিও, টিভি এবং সর্বশেষ ইন্টারনেটের সাহায্যে মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্তে বসে অপর প্রান্তের পিনপতনের শব্দটিও শুনে নিচ্ছে। নিঃসন্দেহে বিরাট অগ্রগতি। প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতির নাম করে এবং তার সুযোগ নিয়ে মানুষের মগজে প্রতিদিন যে কোটি কোটি তথ্য ঢোকানো হচ্ছে, তার সবই কি তথ্য? তথ্যের সংজ্ঞা কী? তথ্যমাত্রই কি প্রয়োজনীয় বা মগজে ধারণ অনিবার্য?



সংবাদপত্রগুলো সংস্করণ করার সময় এসব প্রশ্ন মাথায় রাখলে ভালো হয় বলেই আমাদের বিবেচনাবোধ বলে। আমার বিশ্বাস, সংবাদপত্রে সমাজের সব ছবি ফুটে ওঠা জরুরি। কেননা, সংবাদপত্র হচ্ছে সময়ের দর্পণ। আমাদের সময়টি কেমন ছিল, কেমন ছিল এই সময়ের সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি প্রকৃতি পরিবেশ আইনশৃঙ্খলা, আজি হতে শতবর্ষ পরের কোনো গবেষক আজকের সংবাদপত্র পড়েই তা জানতে পারবেন। সুতরাং যারা বলেন, সংবাদপত্রে অমুক ধরনের খবর বেশি দেয়া ভালো নয় বা তমুক ধরনের খবরকে কাভারেজ বেশি দেয়া উচিত, তাদের সুরুচি ও নান্দনিক বোধের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলি, সংবাদপত্রের সব ধরনের খবরই ছাপা হওয়া উচিত। এমনকি তা যদি হয় ছিঁচকে চুরিরও। কেননা, অনাগত দিনের গবেষক এ থেকেই আমাদের কালের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্বন্ধে ধারণা পেতে পারবেন।



প্রশ্ন উঠতে পারে, সব ধরনের খবর পত্রিকায় ধরাতে গেলে তো পত্রিকা ‘সংস্করণ’ লাগবেই। আমাদের ‘আপত্তি’ও সেখানে। আমরা বলতে চাই, সব ধরনের খবর দেবো এবং আপাতদৃষ্টিতে ‘ছোটখাটো’ খবরকেও সংস্করণের স্বার্থে পত্রিকার পাতা থেকে উচ্ছেদ করবো না- এরকম কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায় কি না। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক দিনই সংস্করণ প্রকাশ করা হবে কি না, সেটিও ভাবা দরকার।



সংস্করণের পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, টেকনাফ বা পঞ্চগড়ের একটি দু’টি ছোট খবর ফেলে দিয়ে সেখানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, রামপুরা বা অন্যান্য এলাকার কোনো খবর ছাপা হলে তাতে পত্রিকার পাঠক বাড়ে, গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।



প্রশ্ন করা যেতে পারে, টেকনাফ, পঞ্চগড় বা রাজধানীর বাইরের ‘ছোট’ খবরের পাঠক কি রাজধানীতে নেই? নিশ্চয়ই আছে (নিবন্ধের শুরুর সত্য ঘটনাটি দ্রষ্টব্য)। তাহলে ওই খবরটি ফেলে দিলে তাদের বঞ্চিত করা হয় না কি? দ্বিতীয়ত, ঢাকার বাইরের খবরটি ফেলে দিয়ে সেখানে স্থানীয় একটি খবর ছাপালে পত্রিকার ‘পাঠক ও গ্রহণযোগ্যতা’ কি আসলে বাড়ে?



ঢাকায় অবস্থানরত যে গ্রামীণ মানুষটি নিজ এলাকার খবর পাওয়ার আশায় পত্রিকা কিনে সেটা না পেয়ে সপ্তাহেশেষে তা ছুঁড়ে ফেলে অন্য পত্রিকার দিকে ঝুঁকলেন, তিনি কি পাঠক বাড়ালেন না কমালেন? আর ‘গ্রহণযোগ্যতা’র অর্থ কী? সব শ্রেণীর পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে তাকে কি গ্রহণযোগ্যতা বলা যায়?



এসব বিতর্কের হাত ধরে যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে তা হলো, তাহলে কি পত্রিকার একাধিক সংস্করণের প্রয়োজন নেই? আমরা বলবো, অবশ্যই আছে। একাধিক সংস্করণ পত্রিকাগুলো অবশ্যই করবে। তবে কখন করবে, কীভাবে করবে সেটাই প্রশ্ন। যেমন ধরা যাক, কুখ্যাত ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার জননন্দিত দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে ভোর রাতে। রাজধানীর পত্রিকাগুলো ওই খবর নিয়ে দ্বিতীয়, এমনকি তৃতীয় সংস্করণও প্রকাশ করে। সেদিন ওই খবর জাতীয় সংস্করণে ছাপানো সম্ভব ছিল না। কিন্তু যদি দ্বিতীয়-তৃতীয় সংস্করণও করা না হতো, তাহলে রাজধানীবাসীকে বঞ্চিত করা হতো। কাজেই একাধিক সংস্করণ প্রকাশ সেদিন ছিল সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এমন মুহূর্ত জাতির জীবনে ক’টি আসে?



আসে না, তাই বলে এমন মুহূতের্র আশায় বসে থেকে জীবন পার করলেও সংবাদপত্রের চলবে না। যুগের চাহিদা, সময়ের প্রয়োজন  এ বড় দায়। তাই একাধিক সংস্করণ তাকে প্রকাশ করতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে, পাঠক যাতে কোনোভাবেই বঞ্চিত বা প্রতারিত না হন। কীভাবে এ দুয়ের সমন্বয় করা যায়, তা ঠিক করবেন মিডিয়া জগতের মানুষেরা এবং মিডিয়াবিশেষজ্ঞগণ। বর্তমান নিবন্ধকার তাদের চিন্তার সূত্র ধরিয়ে দিতে কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করছে।



ক. খুব বড় কোনো ঘটনা না-থাকলে সেদিন দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করা হবে কি না, ভেবে দেখা যেতে পারে। কেননা, দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের একটা খরচের দিকও আছে।



খ. যে রাতে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ হলো না, সে রাতের ছোটখাট ঘটনাগুলো যেন ‘পুরনো বা বাসি হয়ে গেছে’ এই হাস্যকর অজুহাতে পরবর্তী দিনের পত্রিকা থেকে বাদ না যায়। সেগুলো অবশ্যই ছাপাতে হবে। কেননা, রাজধানীর কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত, ছিনতাই কিংবা অন্য কোনো অপঘটনার শিকার ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের খবরটি তার এলাকাবাসী ও স্বজনদের কাছে কখনো ‘বাসি’ হবে না। এসব স্বজন এলাকাবাসীও হতে পারেন, অথবা বাইরের।



গ. রাজধানীর ছোটখাট খবরে রাজধানীর বাইরে দূরপল্লীর লোকজনের আগ্রহ নেই- এ ভাবনাটা ভুল। রাজধানীর যানজট, দুর্ঘটনা, খুনখারাবি, নাটক-সিনেমা, বিনোদন, পার্ক, মাদক ব্যবসা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর থেকে রাজধানীর একটা মানসচিত্র এঁকে নেন পল্লীবাসী। তাদের চোখে রাজধানী এরকমই।



ঘ. দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণ করা হলে স্বাভাবিক কারণে প্রথম মুদ্রণের কিছু খবর বাদ যাবে। কাজেই পরদিন দ্বিতীয় ও তৃতীয় মুদ্রণে ওই বাদ যাওয়া খবর (প্রয়োজনীয় সংশোধন, পরিমার্জনসহ) অবশ্যই ছাপার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে পাঠক বঞ্চিত বা প্রতারিত না হন।


হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী: সাংবাদিক।